আমি খুব সাধারণ একটা মেয়ে। বিবাহিত। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই পনেরো বছরে একটি বারের জন্যও শাঁখা, পলা, লোহা , সিঁদুর, আলতা কিচ্ছু পরিনি। পরার কোনো কারণ খুঁজে পাইনি। আমার স্বামীও আমার মঙ্গল কামনায় কোন চিহ্ন তার শরীরে ধারণ করে না। আমরা দুজন দুজন কে ভালবাসি , বিশ্বাস করি, নির্ভর করি।
আমি জানি যে আমার শাঁখা , সিঁদুরের উপর আমার স্বামীর ভালো মন্দ নির্ভর করে না। একজন স্ত্রী যে তার স্বামীর নিজস্ব সম্পত্তি সেটা বোঝাতেই এই শাঁখা, সিঁদুর, লোহার প্রচলন। সভ্যতার আদিতে ভারতবর্ষ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। অর্থাৎ তখন মেয়েরাই ছিল গোষ্ঠী র প্রধান। পুরুষ তাকে সাহায্য করতো । তাকে সম্মান করতো। তার কথা মেনে চলতো। তখন নারী তাঁর পছন্দ মতো সঙ্গী বেছে নিতে। একটি মেয়ের একাধিক পুরুষ সঙ্গী থাকতে পারতো। তারপর সময় বদলালো। মানুষ স্থায়ী বাসভূমি গড়ে তুললো। পুরুষ যেহেতু শারীরিক ভাবে নারীর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী তাই ভারি কাজ, শিকার করা , এলাকা বিস্তার করা কিংবা নিজেদের গোষ্ঠী কে রক্ষা করা প্রভৃতি কাজে পুরুষ কে প্রয়োজন হলো অনেক বেশি। আস্তে আস্তে পুরুষ নারীকে পিছনে ফেলে আপন শক্তিতে সব কিছুর অধীশ্বর হয়ে উঠলো। সমাজ হয়ে উঠলো পুরুষ শাসিত। এক নারীর অনেক পুরুষ সঙ্গী সে আর মেনে নিতে পারলোনা। তার নিজস্ব নারী কে যাতে অন্য পুরুষ ভোগ করতে না পারে তাই তার হাতে পায়ে বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হলো। সিঁথি রাঙানো হলো রক্তে। যা আজও আমরা বহন করে চলেছি। পুরুষের চাওয়াতেই নারী ক্রমশ হয়ে উঠলো পণ্য।
অথচ নারী কে যুগ যুগান্তর ধরে রক্ষাও করেছে কিন্তু পুরুষ। কি সুন্দর পরম যত্নে নারীকে করে তুলেছে মোহময়ী। আবার নারীও কি অসীম মমতায় আগলে রেখেছে পুরুষ কে। দ্রৌপদী কে যেমন একজন পুরুষ জুয়া খেলায় পণ রেখেছিল, তেমনি আবার তার মান যে বাঁচিয়েছিল সেও কিন্তু একজন পুরুষ। কি অপূর্ব তালমিল।
আসলে নারী পুরুষের সম্পর্ক কি কোন চিহ্নের উপর সত্যিই নির্ভর করে ? জানি না। একটা গল্প বলি। চোদ্দ বছর বনবাসে কাটিয়ে , রাবণ বধ করে , সীতাকে উদ্ধার করে রামচন্দ্র অযোধ্যায় ফিরেছেন। এদিকে প্রজারা সীতাকে মেনে নিতে নারাজ। তার অপরাধ তিনি রাবণের লঙ্কায় কাটিয়েছেন অনেক গুলো দিন। রাবণ কি আর তার সতীত্ব হরণ করে নি ? সুতরাং সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে তাকে। রামচন্দ্র কিন্তু তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন না। তিনি বরং সীতাকে পাঠিয়ে দিলেন বাল্মিকী র আশ্রমে। এই সময়ে সীতাকে জিজ্ঞেস করা হলো তুমি কেন কিছু বলছো না মা ! কেন কোন নালিশ জানাচ্ছ না ? সীতা বলেছিলেন চিরকাল বিপদে পড়লে , কষ্ট পেলে বলেছি হে রাম রক্ষা করো। আজ যখন রামচন্দ্র নিজেই কষ্ট দিচ্ছেন তখন নালিশ জানাবো কাকে ? আবার সীতাকে পরম মমতায় যে বুকে তুলে নিয়ে ছিলেন তিনিও কিন্তু একজন পুরুষ। মহর্ষি বাল্মিকী।
পুরুষ নারীর পারস্পারিক সমঝোতায় সৃষ্টি এগিয়ে চলেছে। সকল সফল পুরুষের পিছনে যেমন একজন নারীর অবদান থাকে একজন নারীর সাফল্যের পিছনেও কিন্তু একজন পুরুষের নিরলস সহযোগিতা থাকে। আর এই পারস্পারিক সহযোগিতা , বিশ্বাস থাকলেই হেঁটে যাওয়া যায় অনেকটা পথ। পুরুষ তুমি নারী কে বাঁধতে চেয়েছিলে কেন ? না , অন্য কোন নারীর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য অথবা হিংস্র জানোয়ারের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নয়। অন্য অনেক পুরুষের নির্লজ্জ লোভের হাত থেকে নিজস্ব নারী কে রক্ষা করতে। হায় রে পুরুষ!! তোমার লোভের শিকারও নারী, আবার বেড়িও পড়াচ্ছ তার ই হাতে পায়ে।
একটা ঘটনা বলি। আমার এক আত্মীয় মাত্র চৌত্রিশ বছর বয়সে বিধবা হয়। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। শ্বশুর বাড়ির লোকজন তার উপর মানসিক নির্যাতন করতে থাকে। উনি তখন নার্সের চাকরি নিয়ে চলে যান বর্ধমানের কাছে কোনো একটা জায়গায়। অনেক বছর পর তার সঙ্গে হঠাৎ দেখা ট্রেনে। শাঁখা সিঁদুর পড়া। আমি বারবার সেদিকে দেখছি সেটা উনি বুঝেছেন। নিজেই বললেন , কি ভাবছো ? আবার বিয়ে করেছি ? নাগো। মানুষের লোভের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য এগুলো আমার অস্ত্র। আমাদের সমাজে একজন বিধবা মহিলার একা থাকা ভয়ানক কঠিন। আমি সকলকে বলেছি আমার স্বামী বিদেশে থাকে , আমি চাকরির জন্য এখানে থাকি। তাছাড়া রাস্তঘাটে , কাজের জায়গায় এই চিহ্ন গুলো অনেক নিরাপত্তা দেয়।
তোমাকে বলছি পুরুষ এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে তুমি আর আমাকে কতগুলো অর্থহীন বাঁধনে বাঁধতে চেয়োনা। তোমার মঙ্গল কামনায় সত্যিই এগুলোর কোন প্রয়োজন নেই। ঠিক যেমন যুগ যুগ ধরে তুমি কোন চিহ্ন ছাড়াই নারীর মঙ্গল চেয়েছো। বরং আমরা দুজনে চলো শেরপা হই। কখনও তুমি, কখনও আমি। যে যখন যেখানে পিছিয়ে পড়বে , ক্লান্ত হয়ে যাবে , ভেঙে পড়বে , হেরে যাবে অন্য জন তাকে হাত ধরে তুলে নিয়ে যাবে। তারপর একদিন দেখবে সভ্যতার এভারেস্ট এর চূড়ায় আমরা দুজনে হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছি। বন্ধনহীন , চিহ্ন হীন ভালোবাসা কে সঙ্গী করে।
যে পুরুষ টির জন্য আমি জন্ম জন্মান্তর ধরে পথ হাঁটছি আমার আজকের কবিতা সেই মানুষটির জন্য।
প্রেমে পড়া বারণ :
তোমায় ভালোবাসবো বলে
সাতটা জনম পার করেছি,
সাত জনমে সাত কোটি বার
তুলসি তলায় দীপ জ্বেলেছি।
সাত সমুদ্র দুখ সয়েছি,
সাতটি মরুর ভার বয়েছি,
সাতটা জনম পথ হেঁটেছি
ক্লান্ত পায়ে বিপদ ঠেলে,
সাতটা জনম পার করেছি
তোমায় ভালোবাসবো বলে।
তোমায় ভালোবাসবো বলে
সবার মাঝে ছিলেম একা,
একলা চলার সেই তো শুরু
সেই তো একা থাকতে শেখা।
দ্বাপর থেকে একলা থাকা
একাই তো বেশ এলাম চলে
পেরিয়ে এলেম সাতটি জনম
শুধু তোমায় ভালোবাসবো বলে।
তোমায় ভালোবাসবো বলে
পণ রেখেছি সাতটি জনম,
তোমার কাছে আসবো বলে
অযোধ্যাতে অগ্নি বরণ।
তোমার জন্য ই জহরব্রত
ভেলায় পাড়ি সাগর জলে
বিষ নিয়েছি অঙ্গুরিতে
তোমায় ভালোবাসবো বলে।।
---- তুহিনা সেন
Subscribe to:
Post Comments
(
Atom
)

No comments