Breaking News

উপন্যাস -ঝরা পাতার বনে


উপন্যাস -ঝরা পাতার বনে।
পর্ব-দশম।
লেখক-আমিনুল হক জাহাঙ্গীর।
কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ির উদ্দেশ্যে অফিস ত্যাগ করবে মিলন।শেষ বারের মত সব কিছু ঠিক ঠাক আছে কিনা দেখে নেয় সে।তারপর মোহনার কক্ষের দিকে পা বাড়ায়।ওর কক্ষের দরজায় দাড়িয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায় সে।কেঁদে কেটে একেবারে চোখ লাল করে ফেলেছে মেয়েটা।ব্যাপার কি!দরজায় নক করতেই মোহনা চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়।
ঃকি ব্যাপার,কি হয়েছে তোমার?
ঃকিছুনা।
ঃকিছু না বললেই হলো!কিছু যে হয়েছে তাতো নিজ চোখেই দেখতে পাচ্ছি।
ঃবললাম তো কিছুনা।আপনি কিছু বলবেন স্যার?
মোহনা স্বাভাবিক আচরণের চেষ্টা করে।
ঃদেখো মোহনা আমি বা আমরা যতই অফিসের ডেকোরাম মেনে চলিনা কেন,নিজেদের আবেগ আর অনুভূতিগুলোকে একেবারে বিসর্জন দিতে পারবোনা।তোমার এমন কিছু হয়েছে যে নিজের চোখের জলকে আটকাতে পারছোনা।তাই সত্যি করে বলো তোমার কি হয়েছে?
এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা।সে বাধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ে।কাঁদতে কাঁদতে জানায় যে বাড়ি থেকে ওর বড় বোন ফোন দিয়ে জানায় যে ওর মা সকাল বেলা মাথা ঘুরে পড়ে যায়।তারপর সেই যে অজ্ঞান হয়েছে যে দীর্ঘ সময় মাথায় পানি ঢাললেও এখনও জ্ঞান ফিরেনি।
ঃখবরটা তুমি কখন জেনেছো মোহনা?
ঃঘন্টা দুয়েক আগে।
ঃএতক্ষণ আমায় বলোনি কেন?
ঃআমি কাউকে বিব্রত করতে চাইনি তাই।
ঃওহ মোহনা,কি বলবো তোমায়,ভাষা খুজে পাচ্ছিনা।ওকে তোমার সাথে আমি পরে বোঝাপড়া করছি।তার আগে মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।এসো আমার সাথে।
আধা ঘন্টার মধ্যে ময়মনসিংহের চরপাড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এম্বুল্যান্স রওয়ানা হয় নান্দাইলের উদ্দেশ্যে।মিলনের এক কাজিন ঐ হাসপাতালের প্রভাবশালী চিকিৎসক। তাকে ফোন করে এম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করে দেয়।তারপর মোহনাকে নিয়ে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছাড়ে।গাড়িতে বসে মোহনাকে কাঁদতে দেখে মিলন কোমল স্বরে ওকে সান্ত্বনা দিতে অনেক কথা বলে।রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে,আর কয়েকটা দিন মায়ের সাথে গিয়ে থাকার ব্যবস্থা করা হবে বলেও আশ্বাস দেয় মিলন।
ধীরে ধীরে মোহনা শান্ত হয়ে আসে।এরপর মিলন বীনার প্রসঙ্গ টেনে জানতে চায় কেন মোহনা তখন এতটা রিয়েক্ট করেছিলো।
ঃএকটা মেয়ে তোমার কাছে এসেছে, তোমাকে দেখতে এসেছে, আর তুমি তাকে এতটা অপমান করতে পারলে?
ঃদেখো মোহনা তুমি এই বিষয়ে কিছু জানোনা,তাই না জেনে অহেতুক কথা বলছো।
ঃআমি কিছু জানতেও চাইনা।আমার ভালো লাগেনি তোমার সেই কঠিন আচরণ। এটা তোমার সাথে অনেক বেশি বেমানান।
ঃকেন বেমানান?
ঃকারো প্রতি দয়ার সাগর আর কারো প্রতি কর্কশ, এমনটা কি ঠিক?
ঃকার প্রতি দয়ার সাগর হয়েছি?
ঃবারে, তোমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে বুঝি?
ঃনা আমি আসলেই কিছু বুঝতে পারছিনা। তুমি কি বুঝাতে চাইছো?
ঃদেখো মিলন,প্রথম যখন মায়ের খবরটা শুনি তখন আমি মাকে দেখতে যাওয়ার জন্য ছুটি নেবো বলে ভাবতেও ভরসা পাচ্ছিলাম না।নতুন চাকরি আর কাজের এত চাপ!অথচ তুমি এত অল্প সময়ের মধ্যে কত কি করলে।এটা কি দয়া নয়?
ঃআমি যা করেছি নিজের জন্য করেছি।তোমার জন্য কিছু করিনি।
মিলনের কথায় অবাক হয় মোহনা।সে বুঝতে পারেনা মিলন কি বলছে এসব।মিলন ওর অবাক হওয়া বুঝতে পারে।
ঃএত অবাক হচ্ছো কেন বলো?তোমার মা কি আমার মা নয়?ক'দিন পরতো মা ই ডাকতে হবে নাকি?
ঃও এই কথা!!এতক্ষণে বুঝতে পারছি সব।আসলে টেনশনে আমি সব ভুলে গেছিলাম।
ঃহ্যা জানিতো একদিন আমাকেও ভুলে যাবে তুমি।
ঃদেখো ভালো হবেনা বলছি।এমনিতেই আজ আমি অনেক কেঁদেছি। এরপর যদি তুমি এমন কথা বলে আঘাত দাও তাহলে,,,
ঃতাহলে কি?
ঃতোমার সাথে কোনো কথাই বলবোনা।
ঃপারবে কথা না বলে?
ঃখুব পারবো,কেন পারবোনা?
ঃহুম, ঠিকই বলেছো। তুমি পারবে।কিন্তু আমি পারবোনা।
ঃমানে?তুমি পারবে,আমি পারবোনা,এর মানে কি?
ঃমানে খুব সহজ।তুমি আমার সাথে কথা না বলে থাকতে পারলেও আমি পারবোনা।
ঃদেখো আমি কিন্তু আবার কান্না শুরু করবো।তখন আর কেউ আমায় থামাতে পারবেনা।
ঃকাঁদো, যত খুশি।তবে তুমি কাঁদলে আমিও কাঁদবো।
ঃকি?
ঃহ্যা,আমিও কাঁদতে পারি।
ঃকচু পারো।বেটা ছেলে কখনও কাঁদতে পারে নাকি?
ঃকে বলেছে পারেনা?
ঃকখনও কখনও পারে।শুনেছি আদরের বউ মরে গেলে নাকি ছেলেরা খুব কাঁদে।আচ্ছা আমি মরে গেলে তুমি কাঁদবে তো?
ঃনা,কাঁদবো না।
ঃজানিতো।তখন তুমি মনের সুখে হাসবে।আরেকটা বিয়ে করতে পারবেতো তাই।
ঃআমি বলি কি,আর আমার সারিন্দা বুঝে কি?
ঃআমি ঠিকই বুঝেছি।
ঃকিচ্ছু বুঝোনি।আমি কাঁদব না বলেছি কারন আমি তোমার আগে মরবো তো তাই তোমার মৃত্যুতে কান্নার,,
মিলনের কথাটা শেষ হতে দেয়না মোহনা। ওর মুখ চেপে ধরে।
ঃএমন কথা বলোনা মিলন।আমি খোদার কাছে দোয়া করেছি,যেনো তোমার কোলে শুয়ে আমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারি।
ঃতার মানে তুমি আমায় বদ দোয়া করলে?
ঃকি বলছো এসব?
ঃতুমি আগে মরো আর আমি তোমার শোক যন্ত্রণায় ছটফট করে মরি,তাইতো?
ঃতুমি বেটা ছেলে,তাই সামান্য শোক সইতে পারবে।আমি মেয়ে,আমি পারবোনা।মোহনা আবার কান্না শুরু করে।
চোখ থেকে জল পড়তে থাকে মিলনেরও।
মোহনা সব টের পায়।এক সময় নিজের মাথাটা মিলনের কাধে ফেলে দুহাতে ওর একটা বাহু জড়িয়ে ধরে।
রাত আটটার মধ্যে হাসপাতালে পৌছে যায় মিলনের গাড়ি।ততক্ষণে রোগীকে ডাঃ দেখানে হয়ে গেছে।প্রয়োজনীয় চেক আপ করিয়ে ঔষধ দেওয়া হয়েছে।ভয়ের কোনো কারন নেই। সময় মত ডাঃএর কাছে রোগীকে নিয়ে আসায় আর রোগীর মাথায় পর্যাপ্ত পানি ঢালায় বড় ধরনের কোনো বিপদ হয়নি।দশটার মধ্যে রোগীর জ্ঞান ফিরে আসে।এক এক করে সবাই রোগীর সাথে দেখা করার অনুমতি পায়।তবে কান্না কাটি করতে নিষেধ করা হয়।তাতে রোগীর মনের জোর কমে যায়।মোহনার মায়ের সাথে তার বড়ো আপা, তার স্বামী আর ছোটো ভাই আকাশ এসেছেন।সকলের সাথে মিলনের কথা হয়।পালা করে সকলকেই রাতের ডিনার করায় মিলন।যদিও ওরা খেতে চাচ্ছিলো না।কিন্তু মিলন তাদেরকে স্বাভাবিক আচরণের পরামর্শ দেয়।
যা রোগীর দ্রুত সুস্থ হওয়ার পূর্ব শর্ত।তারপর মেয়েদেরকে রোগীর কাছে রেখে পুরুষদের নিয়ে মিলনের ঐ কাজিন ডাঃএর বাসায় গিয়ে উঠে।ওকে পেয়ে ওর ভাবী খুব খুশি হয়।কিন্তু রোগীর কথা আগে কিছু না জানানোয় খুব রাগ দেখায়।সাথে সাথে নিজের ডাঃ স্বামীকে ফোন করে রোগীর কন্ডিশন জেনে নেয়।
এরপর যখন জানতে পারেন যে তারা বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে তখন আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারেন না রানু ভাবী।সে কি চিৎকার বকাবকি।
তোকে কে এখানে আসতে বলেছে বদমাস?কেন এসেছিস এখানে? যা বেরো।
শেষে ছেলে মেয়েরা এসে তাদের মাকে শান্ত করে।আর চাচ্চুকে ভবিষ্যতের জন্য সাবধান করে।
সকাল বেলা রানু ভাবি নিজে হাসপাতালে গিয়ে রোগীকে দেখে আসেন।নার্সদের সাথে কথা বলেন।তারপর নার্সকে রোগীর প্রতি যত্নশীল হওয়ার অনুরোধ করে বড় আপাকে নিয়ে বাসায় ফেরেন।সবাইকে নিয়ে একসাথে সকালের নাস্তা খেতে বসেন।(চলবে)
Seen by 4
Like
Comment
Share

No comments